অন্যান্য

ডিসেম্বরে বেতন হবে না ফারমার্স ব্যাংকে

উদ্যোক্তা পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিষদের ব্যাপক অনিয়মের কারণে ডুবতে বসার উপক্রম বেসরকারি ফারমার্স ব্যাংকে নগদ অর্থের চরম সংকট চলছে।

ঋণ কেলেঙ্কারি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে চাপের মুখে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় মঙ্গলবার (১৯ ডিসেম্বর) অপসারিত হয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির এমডি এ কে এম শামীম।

এ অবস্থায় নগদ টাকা না থাকায় প্রায় দুই মাস ধরে ঋণ বিতরণ বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে আস্থা সংকটে জমা অর্থ তুলে নিতে মরিয়া আমানতকারীরা। প্রতিদিনই তারা ব্যাংকটিতে ভিড় করলেও খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে। এ সব কারণে এবার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ।

এমন পরিস্থিতিতে চলতি মাসে কারোরই বেতন পরিশোধ সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির নির্বাহী কমিটির (ইসি) নতুন চেয়ারম্যান আজমত রহমান।

গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, নগদ অর্থ সংকটে আমানতকারীদের টাকাই এ মুহূর্তে পরিশোধ করতে পারছি না। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেব কীভাবে?

জানা গেছে, যাত্রা শুরুর মাত্র তিন বছরের মধ্যেই দেড় হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে ফারমার্স ব্যাংক। তাদের বেতন বাবদ প্রতি মাসে ব্যাংকটির ব্যয় হয় ৫ কোটি টাকারও বেশি।

আজমত রহমান আরও জানান, চলমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকের সব শাখাকে বিতরণকৃত ঋণ আদায় দ্রুততর করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যে শাখা লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী টাকা আদায় করতে পারবে, সে শাখার বেতন-ভাতা দ্রুত পরিশোধ করা হবে।

অনিয়ম, দুর্নীতি ও আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ে জড়িয়ে পড়া ফারমার্স ব্যাংকের সংকট যেন পিছু ছাড়ছে না। খেলাপি ঋণের পাশাপাশি মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকটের দুরবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি। এখন নগদ টাকার সংকট কাটাতে ব্যাংকটি বন্ড ছাড়লেও তাতে আগ্রহ নেই ব্যাংকগুলোর। ফলে বন্ড ছেড়েও ক্রেতা পাচ্ছে না ফারমার্স ব্যাংক।

এদিকে ব্যাংকটির ওপরে সাধারণ আমানতকারীদের মতো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও আস্থা হারিয়েছে। ফলে গত ১২ ডিসেম্বর ব্যাংকটি তারল্য সংকট কাটাতে বাজারে বন্ড ছেড়েও ক্রেতা পাচ্ছে না। পরিস্থিতি সামলাতে সংবাদ মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। সেইসঙ্গে আস্থা ফেরাতে আমানত ও বন্ডে বিনিয়োগকারীদের চড়া সুদ দিতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, নগদ টাকার যোগান বাড়াতে সম্প্রতি বন্ড ছাড়ার অনুমোদন নেয় ব্যাংকটি। কিন্তু ৯ শতাংশ সুদে এই বন্ড বাজারে ছাড়লেও কোনো ব্যাংকই তা কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। গত এক সপ্তাহে এ বন্ড থেকে কোনো অর্থ তুলতে পারেনি ব্যাংকটি। ফলে সহসা ব্যাংকটির আর্থিক সংকট কাটার কোনো সুযোগ নেই।

পরিস্থিতি সামলাতে বন্ডের সুদহার ৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করে ফারমার্স ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি দিয়েছে। এতেও ব্যাংকগুলো এই ব্যাংকের বন্ডে বিনিয়োগ করবে বলে মনে করছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাসুদ বলেন, আমরা আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে কাজ করছি। নিজেরা মূলধন যোগান দিচ্ছি। বন্ড ছাড়া হয়েছে।

বন্ডে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগে এগিয়ে আসছে না উল্লেখ করলে তিনি বলেন, এজন্য আমরা সুদহার কিছুটা বাড়িয়ে দেব। একইভাবে আমানতকারীদের আগ্রহী করতে আমরা আমানতে কিছুটা বেশি সুদ পরিশোধ করব।

ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, চলমান পরিস্থিতি উত্তোরণে সংবাদ মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর চেষ্টা করছে। বিদ্যমান সংকট কাটাতে ব্যাংকটির পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। এজন্য একজন অভিজ্ঞ উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। শিগগিরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তারল্য সংকট কাটাতে পর্ষদে নতুন করে আরো চারজন পরিচালক নিয়ে আসা হতে পারে। মূলধনের যোগান দেবেন শর্তেই তাদের পর্ষদে আনা হবে।

এই ব্যাংকের তারল্য সংকট কাটাতে ৫০০ কোটি টাকা বন্ড বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক। বন্ডটির নাম দেয়া হয়েছে দি ফারমার্স ব্যাংক প্রসপারেটি বন্ড-২০১৭। সরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এই বন্ড বিক্রি করা যাবে। গত ১২ ডিসেম্বর বর্তমানে প্রচলিত সুদহার অনুযায়ী ৯ শতাংশ সুদে বন্ড ইস্যুর অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রসঙ্গত, রাজনৈতিক বিবেচনায় বর্তমান সরকারের গত মেয়াদে অনুমোদন পাওয়া নতুন ৯ ব্যাংকের অন্যতম একটি ফারমার্স ব্যাংক। ব্যাংকটির বিরুদ্ধে নিয়োগ প্রক্রিয়া ও ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ বাংক। ব্যাপক হারে ঋণ বিতরণের ফলে ব্যাংকটির তহবিল শূন্য হয়ে পড়ে। এ জন্য নিয়মমতো বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে ব্যাংকটি। গ্রাহকের জমানো অর্থও ফেরত দিতে পারছে না ব্যাংকটি। ব্যাংক চালাতে ব্যর্থ হওয়ায় গত ২৭ নভেম্বর পদত্যাগ করেন ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। এ ছাড়া ব্যাংকটির নিরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান ও পরিচালক মাহাবুবুল হক চিশতীকেও পদ ছাড়তে হয়। চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদের সব কমিটিই পুনর্গঠন করা হয়েছে। নতুন এমডি হিসেবে প্রাইম ব্যাংকের সাবেক এমডি এহসান খসরুকে নিয়োগ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। ব্যাংকের বর্তমান এমডি একেএম শামীমকে অপসারণের চূড়ান্ত ধাপ ব্যক্তিগত শুনানি গ্রহণ শেষ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

রিলেটেড সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close